Covering SB 64

বন – এ জলবায়ু রণ, কমতে থাকা আর্থিক সাহায্য এবং আলোচনায় নতুন শর্ত যোগ না করার বিষয় দাবি তুলল ভারত

জীবাশ্ম জ্বালানি কমানো আগামী বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে আলোচনা হবে কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে অংশগ্রহণকারী দেশগুলিই: The Plurals কে জানালেন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের জলবায়ু প্রধান

(বাঁ দিক থেকে) বন জলবায়ু সম্মেলনে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের জলবায়ু বিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিল, কপ ৩১ এর প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত তুরস্কের মন্ত্রী মুরাত কুরাম এবং কপ ৩১ এর আলোচনা বিষয়ে প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রী ক্রিস বাওয়েন (Photo Source: The Plurals)

জার্মানির বন শহরে চলা ইউনাইটেড নেশনস আয়োজিত জলবায়ু সম্মেলনে, যার পোশাকি নাম এসবি (সাবসিডিয়ারি বডিজ) ৬৪, ভারত জোরালোভাবে উল্লেখ করেছে যে উন্নত দেশগুলির কাছ থেকে আসা জলবায়ু সংক্রান্ত সাহায্যের পরিমাণ ক্রমেই কমছে, এবং দাবি তুলেছে যে ই গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সাহায্যের বিষয়টি দ্রুত মেটাতে হবে ।

সম্মেলনের প্রথম প্লেনারি বৈঠকে ভারতের বিবৃতি পাঠ করতে গিয়ে বার্লিনে অবস্থিত ভারতের কনস্যুলেট জেনারেলের দ্বিতীয় সচিব হরকিরাত সিং রনধাওয়া বিষয়টি তুলে ধরেন ।

জাতিসংঘের বার্ষিক সাবসিডিয়ারি বডিজ (এসবি) এই বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেননা এখানে আগামী বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন বা কপে, যা আয়োজিত হবে তুরস্কতে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতায়, আলোচনার রূপরেখা তৈরি হবে ।

ভারত তার বক্তব্যে আরো দাবি তোলে যে আগামীদিনে ইতিমধ্যেই নির্ধারিত বিষয়ের বাইরে কোন নতুন আলোচনার বিষয়বস্তু বা শর্ত যোগ করা যাবেনা । এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ কেননা বেশ কিছু দেশ এবং অসরকারি সংস্থারা দাবি তুলছে যে আগামী বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি কমার রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা করতে হবে , যদিও বিষয়টি এখন অব্দি সরকারিভাবে আলোচনার চৌহদ্দিতে নেই । ভারত এবং আরও কিছু উন্নয়নশীল দেশ এই দাবির স্বপক্ষে নেই কেননা তারা মনে করে এর ফলে তাদের জ্বালানি ব্যবহারের স্বাধীনতা ব্যাহত হবে ।

আর্থিক সাহায্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে কাজ বাড়ুক, বলল ভারত

ভারত উন্নত দেশগুলির জলবায়ু অর্থায়নের দায়বদ্ধতা ও তার প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিকেই তার বক্তব্যে গুরুত্ব দেয় ।

“ভারত বিশ্বাস করে যে, এখন আন্তর্জাতিক জলবায়ু কর্মসূচির বাস্তবায়নের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া উচিত এবং আমরা দাবি জানাই যে, অনুচ্ছেদ ৯.১ কর্মসূচিকে তার প্রাপ্য গুরুত্ব ও পৃথক এজেন্ডাগত স্থান দেওয়া হোক” বক্তব্য ভারতের। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির ৯.১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলিকে প্রশমন (mitigation) ও মানিয়ে নেওয়া (adaptation) সংক্রান্ত প্রয়োজন মেটাতে আর্থিক সহায়তা করতে হবে জাতিসংঘের অধীনে তাদের দায়বদ্ধতা ও প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।

” ক্রমেই কমতে থাকা জলবায়ু অর্থায়ন, তহবিল পুনঃপূরণ ও সহায়তার অভাব, এবং অভিযোজন অর্থায়নের ঘাটতি নিয়ে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি” জানায় ভারতের সরকারি বক্তব্য, যার একটি কপি The Plurals এর কাছে আছে ।
ভারত একথাও জানিয়েছে যে অ্যাডাপ্টেশনে বর্তমানে আর্থিক সাহায্য অত্যন্ত কম ।

তথ্য বলছে যে ২০২৩ সালে বৈশ্বিক জলবায়ু সংক্রান্ত আর্থিক সাহায্য ১.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যদিও তা জলবায়ু পরিবর্তনের আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতি বছর যে আনুমানিক ৬ ট্রিলিয়ন থেকে ৭.৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন, তার তুলনায় এখনও অনেক কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আরও উদ্বেগের বিষয় হলো যে জলবায়ু অর্থায়নের ৯০ শতাংশেরও বেশি ব্যয় করা হচ্ছে মিটিগেশনে, যেমন রিনিউবল এনার্জি বা ইলেকট্রিক্যাল ভেহিকেলের ক্ষেত্রে। কারণ এসব ক্ষেত্রে দ্রুত আর্থিক মুনাফা পাওয়া যায়। বর্তমানে জলবায়ু অর্থায়নের মাত্র ৩.৪ শতাংশ অ্যাডাপ্টেশন উদ্যোগে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় কিঞ্চিতকর । ভারতের কোটি কোটি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ, বিশেষ করে সুন্দরবনের মত পৃথিবীর জলবায়ু হটবেডে থাকা অঞ্চলের বাসিন্দাদের টিকে থাকার জন্য, এই তহবিল দ্রুত বাড়ানোর প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা ।

আলোচনার টেবিলে ভারত ফেরালো ইক্যুইটি ও ঐতিহাসিক দায়িত্বের কথা

ভারত বনে জলবায়ু-সংক্রান্ত ন্যায্যতা এবং ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলোকেও আবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সাধারণভাবে মনে করা হয় যে, ভারত এবং উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলি ২০১৫ সালে প্যারিস সর্বসম্মত চুক্তি সম্পাদনের দরাদরিতে ইক্যুইটি ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার মতো বিষয়গুলোর গুরুত্ব শিথিল হওয়া মেনে নিয়েছিল। ওই চুক্তির মাধ্যমে সব দেশকেই, যদিও ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা হয় যদিও আগে এই দায়িত্ব শুধুমাত্র উন্নত শিল্পোন্নত দেশগুলির ছিল।

“ইক্যুইটি এবং ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতাকেও আমাদের পথনির্দেশক নীতি হিসেবে বহাল রাখতে হবে। দারিদ্র্য দূরীকরণ, সবার জন্য জ্বালানি সুবিধা নিশ্চিত করা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যপূরণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত কার্বন নিঃসরণের সুযোগ বা ‘কার্বন স্পেস’ থাকা জরুরি … সুতরাং, উন্নত দেশগুলোকেই দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর মাধ্যমে নেতৃত্ব দিতে হবে,” বলা হয়েছে ভারতের বিবৃতিতে।

জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে ভূ-রাজনীতি তুঙ্গে

ভারত এ কথাও জোর দিয়ে বলেছে যে, সম্মত সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো নতুন ইস্যু বা অতিরিক্ত বাধ্যবাধকতা জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আলোচনার অংশ হওয়া উচিত নয়।

বনের জলবায়ু সম্মেলনে উপস্থিত অনেক জলবায়ু বিশ্লেষক মনে করে যে গত এপ্রিল মাসে কলম্বিয়ার সান্তামারতাতে আয়োজিত জীবাশ্ম জ্বালানি কমানো নিয়ে বৈঠকের পরবর্তী সময়ে বিষয়টিকে সরকারি সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার যে দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, সে প্রসঙ্গকেই ভারতের বিবৃতিতে পরোক্ষে বিরোধিতা করা হয়েছে ।

জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানোর বিষয়ে বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন, সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের এক্তিয়ারের বাইরে, কলম্বিয়া ও নেদারল্যান্ড যৌথভাবে আয়োজন করে। কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার ধাপে ধাপে বন্ধ করার জন্য বাস্তবসম্মত আইনগত, আর্থিক ও অর্থনৈতিক রোডম্যাপ নির্ধারণের লক্ষ্যে ৫৭টি দেশ এতে অংশগ্রহণ করে। ভারত এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেনি যদিও তুরস্ক এবং অস্ট্রেলিয়া —যারা যথাক্রমে কপ ৩১ মনোনীত সভাপতিত্বকারী দেশ এবং আলোচনা প্রক্রিয়ার মনোনীত নেতৃত্বদানকারী দেশ—উভয়ই ওই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিল।

বনে অনুষ্ঠিত জলবায়ু বৈঠকে The Plurals-এর প্রশ্নের জবাবে উভয় দেশের প্রতিনিধিরা বলেন তারা পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে জীবাশ্ম জ্বালানি কমানোর পক্ষে কিন্তু বিষয়টি কীভাবে আগামী বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে আসবে সে বিষয়ে কোন স্পষ্ট ভাবনা জানাননি । “আমরা নতুন কোন দাবি তুলছিনা । দুবাই জলবায়ু সম্মেলনে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয় যে ২০৫০ সালে বিশ্বে সবধরনের জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বন্ধ হবে । সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে গেলে প্রয়োজন এ বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি, যে কাজ অবিলম্বে শুরু করার প্রয়োজন, ” The Plurals কে শুক্রবার বনে বলেন ভানাতুর এক জলবায়ু কর্মী ।

প্রসঙ্গত বনে বিশ্বের প্রথম সারির ৭৪ জন বিজ্ঞানীদের একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যেটি জানাচ্ছে যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জর শেষ রিপোর্টের পর গত পাঁচ বছরে বিশ্বজুড়ে যাবতীয় জলবায়ু পরিবর্তনের নির্দেশক সীমারেখা বা ইন্ডিকেটর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং দাবি করা হয়েছে এর পিছনে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির লাগামছাড়া ব্যবহার।

বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এও মানছেন যে এই প্রবণতার জন্য মূল দায়ী উন্নত ও শিল্পোন্নত দেশগুলি এবং ভারতের মত দেশের পক্ষে অবিলম্বে কয়লা এবং অন্য জীবাশ্ম শক্তি ব্যবহার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো কঠিন কেননা এর সঙ্গে কোটি কোটি মানুষের শক্তি নিরাপত্তা এবং দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের বিষয়টি জুড়ে আছে ।

প্রতিবেদন সহায়তা: সুজাতা বসু, কলকাতা

×