Covering SB 64

বিশ্বে সমুদ্র-জুড়ে রেকর্ড মাত্রায় বাড়ছে তাপপ্রবাহ, জানালো বন জলবায়ু সম্মেলনে প্রকাশিত রিপোর্ট

গবেষণা বলছে ২০৫০ সালের মধ্যে ভারত মহাসাগরে তাপপ্রবাহ প্রায় স্থায়ী হতে চলেছে

গত পাঁচ বছরে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি মাত্রায় বেড়েছে ( Photo source: The Plurals )

জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা থেকে, বিশেষ করে লাফিয়ে বাড়তে থাকা তাপমাত্রার হাত থেকে, রক্ষা নেই জল, স্থল ও অন্তরীক্ষ কোথাওই; জানাচ্ছে গবেষণা ।

জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে ছাপা একটি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র, যা কিনা একইসঙ্গে জার্মানির বন শহরে সাম্প্রতিক বিশ্ব জলবায়ু মিটিংয়েও প্রকাশিত হয়, জানাচ্ছে যে জলবায়ু পরিবর্তন মাপার প্রধান এগারোটি সূচকের মধ্যে  সমুদ্রের জলে তাপপ্রবাহ গত পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ পরিমাণে বেড়েছে । 

পাঁচ বছর আগের পরিস্থিতির সঙ্গে সূচকগুলির কমা বা বাড়াকে প্রতিবেদনে তুলনা করা হয়েছে কেননা ওই সময় জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রকাশিত রিপোর্টে , অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট ৬, এই সুচকগুলির তৎকালীন পরিস্থিতি জানানো হয়েছিল ।

আর্থ সিস্টেম সায়েন্স ডাটা গবেষণা পত্রিকায় প্রকাশিত এই গবেষণায় সংযুক্ত ছিলেন ভারতসহ ১৭টি দেশের প্রায় ৭০ জন শীর্ষস্থানীয় জলবায়ু বিজ্ঞানী, নেতৃত্বে লিডস বিশ্ববিদ্যালয়।

অন্যান্য গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে যে আক্রান্ত দেশগুলির মধ্যে ভারত সামনের সারিতে আছে ।

পরিস্থিতি কঠিন 

মানুষের কার্যকলাপের জন্যই ২০২৫ সালে বিশ্বের উষ্ণায়ন ১.৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা তৃতীয় উষ্ণতম বছর বলে চিহ্নিত হয়েছে।  এই  প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী প্রায় চার বছরের মধ্যেই এই উষ্ণায়নের মাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

“সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পৃথিবীতে যে হারে তাপ সঞ্চিত হচ্ছে, তা ভবিষ্যতেও আরও অনেক বেশি  উষ্ণায়নের ইঙ্গিত দিচ্ছে,” জানাচ্ছে রিপোর্ট । এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, “শিল্পায়ন পূর্ব যুগের তুলনায় ২০১৬-২০২৫ দশকে স্থলভাগের তাপমাত্রা ১.৮১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং মহাসাগরের তাপমাত্রা ১.০৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে।”

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্ব উষ্ণায়নকে বোঝার  জন্য  প্রাক-শিল্পবিপ্লব যুগের তাপমাত্রাকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয় কারণ মানুষের কারণে ঘটা উষ্ণায়ন শুরু হয় ১৮৫০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে হওয়া শিল্পবিপ্লবের সময় থেকেই।

বাড়ছে সব সূচকই

এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের গতিবিধি বোঝার  জন্য মূলত যে এগারোটি প্রধান সূচক আছে, সেগুলি সবকটিই গত পাঁচ বছরে বেড়েছে। এদের মধ্যে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ সবচেয়ে দ্রুত হারে বেড়েছে, ৬১.১ শতাংশ; এর পরেই রয়েছে পৃথিবীর শক্তি ভারসাম্যহীনতা ( এনার্জি ইমব্যালেন্স), যা ৪১.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে পাঁচ বছর আগের তুলনায়।

বৃদ্ধির তালিকায় থাকা পরবর্তী দুটি সূচক হল সর্বোচ্চ দৈনিক তাপমাত্রা, যার বৃদ্ধি ২৩.৯ শতাংশ, এবং মানুষের তৈরি উষ্ণায়ন, যার বৃদ্ধি ১৫.৯ শতাংশ। গ্রিনহাউস গ্যাস সামগ্রিকভাবে ২.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রধান উপাদান কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইড বেড়েছে যথাক্রমে ৩.৮, ৩.৮ এবং ২.২ শতাংশ।

মানুষই দায়ী

বনে রিপোর্টটি প্রকাশ কালে একজন জলবায়ু বিশেষজ্ঞ বলেন যে, “সমস্ত তথ্যই দেখাচ্ছে যে জলবায়ু যে দিকে যাওয়া উচিত তার ঠিক বিপরীত দিকে যাচ্ছে, এবং এই আত্মঘাতী প্রবণতার জন্য রাজনীতিবিদরাই দায়ী।”

লীডস বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রিস্টলি সেন্টার ফর ক্লাইমেট ফিউচারস’-এর পরিচালক এবং উল্লিখিত গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক অধ্যাপক পিয়ার্স ফরস্টার বনে এই প্রতিবেদকের কাছে ব্যাখ্যা করে বলেন যে, শক্তির ভারসাম্যহীনতা কে জলবায়ুর মূল সূচক হিসেবে ধরা হয়  কেননা এই সূচকটি জানায় যে কত দ্রুত তাপ আবহাওয়ায় জমা হচ্ছে । “এখন এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে  রয়েছে, যা সাম্প্রতিক কয়েক দশকে  দ্বিগুণ হয়েছে,” জানান গবেষক । তিনি আরও যোগ করেন যে, “মানুষের  প্রভাব  যদি না  থাকত তাহলে  এটি হয়তো শূন্যের কাছাকাছি থাকত কিন্তু ১৯৭০-সাল থেকে এর মাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।” 

জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোই মূল কারণ

সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে বিশ্ব জুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাস বাড়ছে; যার মধ্যে ৫৬.৮ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড বা সমগোত্রীয় গ্যাস । 

“আমাদের গবেষণা প্রমাণ করছে যে, গত দশকের প্রায় সমস্ত উষ্ণায়নই  মানুষের  ক্রিয়াকলাপের কারণে ঘটেছে । জীবিকা এবং বাস্তুতন্ত্রের ওপর এর প্রভাব ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী, এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার সঙ্গে সঙ্গে এটি আরও বাড়বে,” বলেন ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস’ -এর আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ এবং এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আরেক বিজ্ঞানী ।

ভারত মহাসাগর দ্রুত তপ্ত হচ্ছে

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মেটেরিওলজির বিশিষ্ট ভারতীয় আবহাওয়া বিজ্ঞানী রক্সি কলের গবেষণা স্পষ্ট দেখাচ্ছে কিভাবে দ্রুত তপ্ত হচ্ছে ভারতীয় মহাসাগর সামুদ্রিক তাপ্প্রবাহের কারণে ।

” যদিও ভারতীয় মহাসাগরে প্রতি একশো বছরে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হিসাবে তাপমান বেড়েছিল ১৯৫০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে, বিভিন্ন ক্লাইমেট মডেলের হিসাব ভবিষ্যতবাণী করছে যে এই বৃদ্ধির হার ২০২০ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে প্রতি একশো বছরের মাপকাঠিতে  ১.৭ থেকে ৩.৮ ডিগ্রি হওয়া সম্ভব” জানাচ্ছেন বিজ্ঞানী।

যদিও পুরো সামুদ্রিক অঞ্চল জুড়েই তাপমান বাড়বে কিন্তু সর্বোচ্চ বৃদ্ধি ঘটতে পারে উত্তর পশ্চিম ভারতীয় মহাসাগরে যার মধ্যে পড়ছে আরব সাগর ।  “ভারত মহাসাগরে এই দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধি শুধুমাত্র সমুদ্রের উপর ভাগেই আটকে থাকবেনা, তা সমুদ্রের জলস্তর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার নিচ অব্দি ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা,” জানাচ্ছেন বিজ্ঞানী কল ।  

তার গবেষণা এও বলছে যে সামুদ্রিক হিট ওয়েভের পরিমাণ বিপুল পরিমাণে বাড়তে চলেছে। “১৯৭০ থেকে ২০০০ দলের মধ্যে গড়পড়তা বছরে যে ২০ দিন মত সামুদ্রিক হিট ওয়েভ হত সেই আগামী সময়ে বছরে ২২০ থেকে ২৫০ দিন হওয়াও সম্ভব;  বস্তুত ট্রপিক্যাল ভারতীয় মহাসাগর একুশ শতকে প্রায় স্থায়ী হিট ওয়েভ পরিস্থিতিতে চলে যাবার মত জায়গায় পৌঁছচ্ছে,” সাবধান করেছেন ভারতীয় বিজ্ঞানী যিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু রিপোর্টের লেখক ।

প্রতিবেদন সহায়তা: সুজাতা বসু, কলকাতা

×